জীবন রক্ষায় রক্তের বিকল্প নেই। জীবন আর রক্ত এক ও অবিচ্ছেদ্য। কারণ রক্ত ছাড়া জীবন কল্পনা করা যায় না। বিশুদ্ধ রক্তের অভাবে মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হয়। আবার মৃত্যুর কোলেও ঢলে পড়ে। বিশুদ্ধ রক্ত জীবন বাঁচায়, দূষিত রক্ত জীবন ঝুঁকিপূর্ণ করে, এমনকি মৃত্যুরও কারণ হয়। রক্তের প্রয়োজনটা মানুষ প্রচ-ভাবে অনুভব করে কোনো দুর্ঘটনা শিকার হয়ে প্রচ- রক্তক্ষরণ হলে। তখন রোগীকে সময়মতো নিরাপদ রক্তপ্রদানে ব্যর্থ হলে জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই সুস্থ জীবনের জন্যে নিরাপদ রক্তের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে অজ্ঞ। তারা জানেন না বিশুদ্ধ রক্তের অভাবে মানুষের জীবন চরম ঝুঁকিতে পড়ে। জানেন না বাজারে যে রক্ত সাধারণত পাওয়া যায় তা কত টুকু ঝুকিপূর্ণ, কীবাবে তা জীবন সংহারী হতে পারে। যার কারণে নিরাপদ রক্তের ব্যাপারে জনসচেতনতা সৃষ্টি বর্তমানে সময়ের দাবি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। জীবন বাঁচাতে নিরাপদ রক্তের প্রয়োজনীয়তা সাধারণ মানুষ উপলব্ধি করতে সক্ষম হলে এবং সরকার কঠোর হস্তে রক্তবাণিজ্য বন্ধ করতে উদ্যোগী হলে আশা করা যায় নিরাপদ রক্তের সংকট দূরীভূত হবে।
মানবদেহের অপরিহার্য উপাদান রক্ত। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশে এখনও রক্তদান ও সংগ্রহের ক্ষেত্র সাধারণ মানুষ তেমন সচেতন নয়। শুধু তাই নয় রক্ত সম্পর্কে সাধারণ মানুষের এই অজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির মানুষ দূষিত রক্তের বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েছে। তারা ঝুঁকিপূর্ণ রক্তের বাণিজ্য করে একদিকে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ রক্তগ্রহীতাদের জীবন ঝুঁকিতে পড়ছে। কিন্তু জীবন রক্ষাকারী রক্ত নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের বাণিজ্য সাধারণ মানুষের জন্যে চরম হুমকি সৃষ্টি করলেও এদের বিরুদ্ধে কোনো সাড়াশি অভিযানের খবর নেই। এতে আশকারা পেয়ে তারা বেপরোয়া গতিতে তাদের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। পরীক্ষা ছাড়া দূষিত রক্ত বিক্রি করে তারা অর্থের পাহাড় গড়লেও রক্ত গ্রহীতাদের জীবন হচ্ছে সংকটাপন্ন। দূষিত রক্ত মানুষের জীবনকে ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যুর দিকে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী দেশে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ২০২টি রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্র আছে। এর মধ্যে চালু আছে ১৪৬টি। কিন্তু গুটিকয়েক ছাড়া প্রায় সবাই নানা অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত। আবার নিবন্ধনহীন অসংখ্য রক্ত পরিসঞ্চালন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানই মূলত নানাভাবে রক্তের বাণিজ্য করে মানুষের জীবনকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিভিন্ন সময় পত্রিকায় এসব বিষয়ে দূষিত খবর ছাপা হয়েছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্রগুলো মাদকাসক্ত পেশাদার রক্তদাতাদের কাছ থেকে রক্ত নিয়ে থাকে। আবার পরপর রক্ত দেয়ার মাঝে সময় ৪ মাস নিয়ম থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই মাদকসেবীরা মাদকের টাকার যোগান দিতে প্রতি মাসেই রক্ত দিয়ে থাকে। সে রক্ত এইচআইভি, হেপাটাইটিস বি ও সি, ম্যালেরিয়া জীবাণুমুক্ত কি না তা পরীক্ষা করা হয় না। ফলে দূষিত রক্ত গ্রহণ করে গ্রহীতাও সে জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়ে পড়ে। নিয়মানুযায়ী রক্ত সংগ্রহের সময় রক্তবাহিত পাঁচটি রোগের পরীক্ষা করতে হয়। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা করা হয় না। রক্তের ক্রস ম্যাচিংয়ের সময়ও তা উপেক্ষিত হয়। আবার রক্ত সংগ্রহ করার পর ফ্রিজআপ করে ২১ থেকে ২৮ দিন পর্যন্ত রাখা গেলেও প্রয়োজনীয় জেনারেটর সুবিধা ছাড়াই গড়ে ওঠা কিছু অনুমোদনহীন নামসর্বস্ব ব্লাড ব্যাংক উপযুক্ত তাপমাত্রায় সে রক্ত সংরক্ষণ করে না। ফলে সেসব রক্ত গ্রহণ করে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন রক্ত গ্রহীতারা।
বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় সাড়ে ৪ লাখ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন। কিন্তু সে তুলনায় রক্তের সরবরাহ অনেক কম। আবার সরবরাহকৃত রক্তের মধ্যেও একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দূষিত। দূষিত রক্ত মানুষের জীবনকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাই এ বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি নিরাপদ রক্তের সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। অবৈধ রক্তের পরিসঞ্চালন প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি বৈধ প্রতিষ্ঠানগুলো রক্ত পরিসঞ্চালনের ক্ষেত্রে নীতিমালা মেনেছে কিনা সে বিষয়ে যথাযথ মনিটরিং থাকতে হবে। কেউ নিয়ম-নীতি না মেনে রক্ত বাণিজ্যে যুক্ত হলে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের কারণে অনেকে পুরোপুরি সুস্থ থেকেও রক্ত দানে আগ্রহী হন না, আবার অনেকে ঝুঁকির মধ্যে থেকেও রক্তদানে আগ্রহী হয়। তাই রক্তদানের উপকারিতা ও নিয়ম-কানুন সম্পর্কে জনগণকে ওয়াকিবহাল করতে হবে। একই সঙ্গে দূষিত রক্ত গ্রহণের ঝুঁকি সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে হবে এবং অবৈধ রক্ত সঞ্চালন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে কার্যকরি আইনি পদক্ষেপ। আমরা আশা করতে চাই, সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যকে ঝুঁকিমুক্ত করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এ বিষয়ে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন